মুস্তাফিজের অন্য এক পরিবার

mustafz
সোফায় আয়েশি ভঙ্গিতে শোয়া মুস্তাফিজ। বাঁ হাতটা কালো একটি ব্যাগের মধ্যে ভরে গলার সঙ্গে ঝোলানো। অন্য হাতে চলছে মোবাইল টেপাটিপি। আর মাঝে মাঝে দৃষ্টি ফেলছেন সামনের টিভি পর্দায়। একটু পর দাঁত দিয়ে কামড় দিয়ে ব্যাগের ফিতাটা খুলে নিজে নিজেই হাতটাকে বের করে নিলেন। ডান হাত দিয়ে বাঁ হাতকে আলতো করে ধরে খানিকক্ষণ ওপর নিচ করে নাড়লেন। পাশে থাকা অন্যরা আগ বাড়িয়ে সাহায্য করতে চাইলেও মুস্তাফিজ নিজেই সামলে নিলেন সবকিছু।

গতকাল দুপুরে মুস্তাফিজকে দেখতে গিয়ে ঘরে ঢুকতেই দেখা মিলল এমন দৃশ্যের। কাছেই খাবার টেবিলে বসে চা পান করছেন প্রবাসী ক্রিকেট সংগঠক নইম উদ্দিন রিয়াজ। তিনিও এসেছেন মুস্তাফিজকে দেখতে। সঙ্গে করে এনেছেন রসমালাই। সেই রসমালাই খাওয়া শুরু হলো আর কথা জমল বাংলাদেশ ক্রিকেটের অতীত-বর্তমান নিয়ে। কথা বলতে বলতে মুস্তাফিজ রসমালাইয়ের বাটি শেষ করে আরেকটু চাইলেন। সাদরে রসমালাই দিতে দিতে গৃহকর্তা রূপম বললেন, ‘ভাবছিলাম মুস্তাফিজ কেবল ঝাল খাবার পছন্দ করে। এখন দেখছি সে রসমালাইও পছন্দ করে!’

পূর্ব লন্ডনের ডেগেনহাম এলাকার বাংলাদেশি দম্পতি রূপম-কান্তার বাসায় অবস্থান করছেন মুস্তাফিজ। মু্স্তাফিজ যুক্তরাজ্যে আসার পর থেকেই তাঁকে সার্বক্ষণিক সঙ্গ দিচ্ছেন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী এজিএম সাব্বির। সাসেক্স টিম থেকে বিদায় নেওয়ার পর থেকেই মুস্তাফিজ ছিলেন সাব্বিরের বাসায়। গত বৃহস্পতিবার মুস্তাফিজের বাঁ কাঁধে অস্ত্রোপচারের পর দু রাত হাসপাতালে কাটিয়ে ছাড়া পেয়েছেন শনিবার। তাই একটু বাড়তি যত্ন-আত্তি লাগবে বলে সাব্বির নিজেই মুস্তাফিজকে নিয়ে উঠেছেন বোনের বাসায়। রূপম-কান্তা দম্পতিও মুস্তাফিজকে আপ্যায়িত করতে পেরে বেশ আনন্দিত। মুস্তাফিজের সার্বক্ষণিক খেয়াল রাখার পাশাপাশি চেষ্টা করছেন তাঁর পছন্দের খাবারগুলো রান্না করে খাওয়াতে।

আলাপের এক ফাঁকে অস্ত্রোপচারের স্থানে ঠান্ডার ছোঁয়া দিতে বরফের ব্যাগ (আইচ ব্যাগ) চাইলেন মুস্তাফিজ। বাসার লোকজন হুড়োহুড়ি করে সেই ব্যাগ খুঁজতে লাগল। মুস্তাফিজ নিজেই রান্না ঘরে গিয়ে সেই ব্যাগ বের করে নিয়ে এলেন। কাছে ঘেঁষতেই নানা ভঙ্গিতে আদর করে দিচ্ছেন রূপম-কান্তা দম্পতির কেবল হাঁটতে শেখা একমাত্র ছেলে আরিজকে। অতিথি নন—মুস্তাফিজ যেন এই পরিবারেরই একজন। একেবারে ঘরের ছেলে।

পারিবারিক আবহই ভালো লাগে তাঁর। এ কারণে একটু ছুটি পেলেই ছুটে যান গ্রামে, মায়ের কাছে। পাঁচতারকা হোটেলের দামি খাবারের চেয়ে মায়ের হাতের ভর্তা ভাতের স্বাদ যে অনেক ভালো! মুস্তাফিজ যেন সেই পরিবারের আবহ পান, এ জন্য চেষ্টার কমতি নেই এখানে। তাঁকে দেখেও বোঝা গেল, বেশ স্বস্তিতেই আছেন।

বললেন, জীবনের প্রথম অস্ত্রোপচারের মুখোমুখি হলেও বিশেষ কোনো ভয় ছিল না, যদিও তিনি ছোট বেলা থেকে সুঁই ভয় পেতেন। জানালেন সুস্থবোধ করছেন, ভালো আছেন। প্রতিদিন বাংলাদেশে বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা হচ্ছে। বাবা-মা তাঁর অস্ত্রোপচার নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় ছিলেন স্বাভাবিকভাবেই। মুস্তাফিজের উদ্বিগ্ন মা গৃহকর্ত্রী কান্তার সঙ্গে নিয়মিত কথা বলেন। কান্তা অভয় দেন, ‘খালা আমরা মুস্তাফিজের পাশে আছি, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না।’

এসব আলাপের মাঝেই নইম উদ্দিন রিয়াজের মোবাইলে যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার খন্দকার এম তালহার ফোন। মুস্তাফিজের কুশল জানলেন। মুস্তাফিজ তাঁকে জানালেন, বুধবার (১৭ আগস্ট) তাঁর চিকিৎসকের সঙ্গে আবার সাক্ষাৎকার রয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে মুস্তাফিজকে নিয়ে আগামী শুক্রবার দেশের উদ্দেশে রওনা দেবেন বলে জানান সাব্বির।

সাব্বির প্রথম আলোকে বলেন, ঘরোয়া পারিবারিক পরিবেশই মুস্তাফিজের পছন্দ। বাংলাদেশি খাবার-দাবার ছাড়া অন্য খাবার খুব একটা খেতে পারে না। তাই ওর জন্য এসবের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
মুস্তাফিজ এখন বাংলার সব পরিবারেরই আপনজন। তাঁর জন্য প্রার্থনা করে সবাই। সেটা বিদেশেও খুব সত্যি বৈকি। সৌজন্যে: প্রথম আলো

Rent for add