ডিজিটাল যুগে দাবায় ‘চুরি’ বিদ্যা

rafiq-chess-ctgমহাকবি ইয়োহান ভোলফগাং ফন গ্যোটে বলেছিলেন, ‘দাবা বুদ্ধিমত্তার পরশ-পাথর।’ কিন্ত কালের বিবর্তনে এ খেলাটি আজ সুপার কম্পিউটার নির্ভর হয়ে পড়েছে, দাবাড়ুরা এই ডিজিটাল সময়ের চূড়ায় এসে দাবা বোর্ড, দাবা বই, প্রিন্ট বই ইত্যাদি প্রায় ভুলতে বসেছে!

চৌষট্টি খোপের এ দাবার জমিনে এখন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন মিখাইল তালের সেই জাদুকরী বিসর্জন বা ববি ফিশারের নিখুঁত ও নিশ্চিত মিসাইল চালগুলো আর সহজে দেখা যায়না! গ্যারি কাসপারভের আট/দশ চালের নিখুঁত ও সাহসী, গাণিতিক ও ইনভেটিভ কম্বিনেশন এখন প্রায় অদৃশ্য!

গণিত ও কল্পনার ক্যানভাসে আঁকা শিল্পীর বিস্ময় দাবা বোর্ডে আজ তেমন দেখা যায়না, যার প্রতিবাদে বিশ্বের অনেক বড় বড় দাবা পন্ডিত ও গ্র্যান্ডমাস্টারদের দেখা যায় প্রতিনিয়ত আক্ষেপ করতে অতিমাত্রায় এই মেশিন নির্ভরতার বিরুদ্ধে।আক্ষেপ আক্ষেপই থেকে যায়, কোন কাজ হয়না। দাবাড়ুরা মেশিন চালিত রোবটে পরিণত হয়ে যায়।দাবার নান্দনিকতায় ছন্দ পতন কেউ ঠেকাতে পারছে না।

দাবা খেলায় এই ডিজিটাল থাবার আরেকটি দিক উদয় হলো, আর তা হচ্ছে ক্রিকেট খেলার সে টি২০! বা বিদ্যুৎ গতির দাবার জনপ্রিয়তা।ক্রিকেটের এই টি-২০ কে আমি আমার এক লেখায় বলেছিলাম, ক্রিকেট- কুইকী! মারমার, কাটকাট খেলতে খেলতে ক্রিকেটের সেই নান্দিকতা কোথায় যে তলিয়ে গেছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা!

তবে দাবায়ও সেই ‘তাড়াহুড়া’ Blitz দাবার আনন্দ মোচনে তার স্থিতিকাল ৫ মিনিট থেকে কমতে কমতে ৩ মিনিট, এমনকি ২ বা ১ মিনিটও চলে গেল, চড়ুই পাখির মত উটবস করতে করতে দাবাড়ুরা দুধের স্বাধ ঘোলে মিঠাতে যখন ব্যস্ত, ঠিক তখনই দেখা দিল এক দাবা মহামারি!

ভদ্রলোকের লোকের খেলা, বুদ্ধিমত্তার পরশ পাথর আজ এক নষ্ট থাবায় আক্রান্ত হয়ে হারাতে বসেছে হাজার বৎসরের ঐতিহ্য। বর্তমান সময়ের মহামারি করোনাভাইরাসটি দাবায় এসে হয়েছে দাবায় ‘চুরি’!!??

চমকে গেলেন তাইনা?! হ্যাঁ, আপনার মতো আমিও চমকে গিয়েছিলাম। পুরো দাবা বিশ্ব এখন এই ‘চুরি’ মহামারিতে আক্রান্ত! অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, সে চুরি এখন দাবার লম্বা ভাসর্শন থেকে তার শর্ট ভার্শন ৫ বা ৩ মিনিটের খেলাও তার কালো থাবা বসিয়ে দিয়েছে!

ফলে দেখা যাচ্ছে, আপাত দৃষ্টিতে যা সম্ভব না তা হচ্ছে নাম না জানা নতুন দাবাড়ু ৭ ম্যাচে ৭ বা ৯ ম্যাচে ৯ পেয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাচ্ছে!! আর ভালো খেলোয়াড়রা তদন্ত করতে করতে এক সময় তা আবিষ্কার করে, যে প্ল্যাটফর্ম chess.com বা অন্য আর কোন সাইটে চুরির প্রতিবাদ জানাতে জানাতে ওই দাবাড়ুর চুরির প্রমাণ সাপেক্ষে তার দাবা একাউন্ট লক করে দিচ্ছেন।

কি দাঁড়াচ্ছে পরিণতিতে, কেন বা কীভাবে এলো এই ‘চুরি’র হিড়িক? খেলা শেখার আগেই চুরি বিদ্যা, এই নৈতিক অবক্ষয় কেন বা কিভাবে এলো এই শুদ্ধ জগতে?

এখানেও কি সেই সমস্যা ঢুকে গিয়েছে, ভালো বা যোগ্য বংশের রক্তে মিশে যাচ্ছে অবংশের রক্ত?! সমাজ বিজ্ঞানীরা বলতে পারবেন ভালো, তবে তাদের চিন্তার গন্ডি বড় হয়ে যাবে তা নিশ্চিত!!

আমি গত ২০১০ সাল থেকেই এই chess.com এ দাবা খেলে আসছি, আমার ব্যস্ত জীবনের অল্প সময়ে দাবা খেলার সাথে নিজেকে যুক্ত রাখার প্রয়াসে। ৫ বা ১০ মিনিটের অনলাইন চ্যালেঞ্জ দাবা খেলে মজা পেয়ে আসছিলাম নিজের মতো করেই। তার মাঝে খেয়াল করতাম বেশ কিছু সংখ্যাক অনলাইন দাবার আমন্ত্রণ আসছে ইনবক্সে। মেসেজ পড়তাম বা খুলেই দেখতাম না সময়ের অভাবে। কিন্ত ইদানিং এই করোনাকালে যখন দেখলাম দেশের কিছু দাবা ক্লাব বা দাবাড়ু ৩ বা ৫ মিনিটের অনলাইন দাবা প্রতিযোগিতার আয়োজন করছেন তখন নিতান্ত সময় কাটানোর সাথে সাথে দেশী দাবাড়ুদের সাথে একই প্ল্যাটফর্মে মিলিত হওয়ার প্রয়াসে দু টি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করলাম, আর ঠিক তখনই জানতে পারলাম এই দাবা মহামারী,‘চুরি’র ঘটনা সম্পর্কে!!

সার্বিক পরিস্থিতি বিচার করে এই লেখার প্রয়াস পারলাম। নিজেকে একটি সিদ্ধান্তের দােরগোড়ায় নিয়ে আনতে, সাথে আমার জানা সকল দাবাড়ুদের সাথে এই বিষয়ে একটি ডিবেট বা আলাপচারিতা তৈরির উদ্যোগে।

তবে, এই মুহূর্তে আমার নিজের ভাবনাটি হচ্ছে, আমি কি এই ‘চুরি’ ভাইরাসে আক্রান্ত জগতে নিজেকে জড়িয়ে রেখে এর বোঝা বা টেনশন নিয়ে চলবো, নাকি এটিকে লাঠি ও লাথি দুটোই মেরে এই পঁচে যাওয়া জায়গা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেব?? মন্দ রক্ত তার কাজ তার মতোই করতে থাকুক। কারণ পঁচে যাওয়া রক্ত পরিশোধন করা সম্ভব নয়, এটিকে ত্যাগ করতে হয়।

না, দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম এই দূষিত জায়গায় আর নয়, আমি আমার মতোই থাকি যেমন থেকেছি এতগুলো বৎসর।যাওয়ার আগে বলে যাই, মহান দাবা খেলা তার আগের জায়গায়ই আছে, তবে মানুষগুলো নষ্ট হয়ে গেছে, পঁচে গেছে। (যাদের জন্য প্রযোজ্য, ওই চোরেরা)
ড. তাড়াশ এর সেই বিখ্যাত উক্তি দিয়েই এই পরশ পাথরের গুণগান করে শেষ করছি,
‘প্রেমের মতন, সঙ্গীতের মতন,
দাবারও ক্ষমতা আছে একজন মানুষকে সুখী করার।’

লেখক : সাবেক জাতীয় দাবাড়ু

Rent for add